• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

১৮ বছরের স্মৃতি: খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ও গণতন্ত্রের বিজয়

১৮ বছরের স্মৃতি: খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ও গণতন্ত্রের বিজয়

সর্দার এম জাহাঙ্গীর হোসেন

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গড়ে উঠেছে। এই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর কারামুক্তি দিবস শুধু একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত মুক্তির স্মারক নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ধারার মুক্তির প্রতীক।

 

স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রের বিপর্যয়

 

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে (১৯৭২–১৯৭৫) বহুদলীয় রাজনীতি ও সংবাদপত্র বন্ধ করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল চালু হয়। এতে গণতন্ত্র মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হন এবং দেশে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।

 

এই প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করেন, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে তিনি ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ হন।

 

রাজনৈতিক উত্থান

 

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একটি গণমানুষের দলে পরিণত হয়।

 

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফলে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতন ঘটে এবং দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়।

 

গণতান্ত্রিক ধারায় নেতৃত্ব

 

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুসংহত হয়, দেশ এগিয়ে যায় আন্তর্জাতিক পরিসরে।

 

২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে খালেদা জিয়া আবারও প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি নতজানু পররাষ্ট্রনীতি পরিহার করে পারস্পরিক সম্মান ও সমতা ভিত্তিক কূটনীতি অনুসরণ করেন।

 

প্রতিহিংসার শিকার

 

বেগম খালেদা জিয়া সবসময় জনগণের সঙ্গে থেকেছেন, কখনো দেশত্যাগ করেননি। ১/১১ সরকারের সময় তাঁকে দেশ ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি বারবার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।

 

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। এক বছর সাত দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান। এ দিনটি পরবর্তীতে গণতন্ত্রের কারামুক্তি দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। আজ ২০২৫ সালে তাঁর ১৮তম কারামুক্তি দিবস উদযাপিত হচ্ছে।

 

পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আবারও মিথ্যা মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর সুযোগ্য সন্তান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও শতাধিক মিথ্যা মামলার শিকার হতে হয়।

 

নতুন বাংলাদেশ ও খালেদা জিয়ার প্রভাব

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হয়। এ গণঅভ্যুত্থান যেন খালেদা জিয়ার আপোষহীন সংগ্রাম ও নেতৃত্বের প্রতিফলন।

 

গণতন্ত্রের প্রতিটি আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতা বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। এজন্যই তাঁকে বলা হয় মাদার অব ডেমোক্রেসি।

 

১১ সেপ্টেম্বরের কারামুক্তি দিবস শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব ও দৃঢ় অবস্থান আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

 

আমরা তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি এবং আশা করি, গণতন্ত্রের এ মহান নেত্রী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন।

 

লেখক 

গবেষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ( চায়না) যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:০৪এএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।