বাকাট্টা ঘুড়ি মার্কিন বুড়ি আর কিছু
১৭ই আগস্ট গিয়েছিলাম ক্যালিফোর্নিয়ার লং বিচে। প্যাসিফিক কাইট ক্লাবের আয়োজনে সেখানে ঘুড়ি উৎসবের জমজমাট আসর বসেছিল।
প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ের বিখ্যাত এই সৈকতের আকাশ তখন হরেক রং-নকশা আর চেহারার শত শত ঘুড়িতে ঝলমল করছে।
কাইট ক্লাবের সভাপতি বন্ধু Zia Shawan আমাকে দেখেই তাড়া দিলো- এত দেরি করলি! একটা ঘুড়ি দেই, বাচ্চাদের নিয়ে উড়িয়ে নে আগে।
আগে কিছু খেয়ে নেই। ক্ষুধা লাগছে হেবভি। গাড়িতে ছিলাম অনেক ক্ষণ।
আচ্ছা, বলে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সাংগঠনিক তদারকিতে।
বাংলাদেশি-আমেরিকানদের এই আয়োজনে স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল অন্যান্য জাতপাত সম্ভূতদেরও। ফুচকা, সিংগারা, মুড়িভর্তা, দইবরা, বরফি, বালুসাই, মালাইচপের অভাব ছিলনা। ৫ মিনিটে উদরপূর্তি শেষে ঘুড়ির জন্য এবার শাওনের খোঁজ করি।
কাছে গিয়ে দেখি- মায়ের বয়সী ঢ্যাঙা এক স্বেতাঙ্গিনি (বয়স সত্তরের কোঠায় কিন্তু শারীরিকভাবে শক্তপোক্ত) ওর সঙ্গে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কী যেন বলছেন। হাতে তার বাকাট্টা হওয়া ছেঁড়া ঘুড়ি আর সুতো।
আফটার অল ব্যক্তি-স্বাধীনতার শিখরভূমি মার্কিন মুল্লুকে আছি। অনধিকার দখলদারির অপবাদ @এড়াতে নিরাপদ দূরত্বে ব্রেক কষলাম।
ওদিকে ‘আম্মাজান‘ একপর্যায়ে কেঁদে ওঠেন। বন্ধু সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়। আরো কিছুক্ষণ বাতচিতের পর উনি কিছুটা শান্ত হলেও একপর্যায়ে ঈষৎ অসন্তুষ্ট চিত্তেই হাঁটা ধরলেন।
এবার জোরে হাঁক ছাড়ি- অই শাওন! কী কথা কস এতক্ষণ হের লগে! ঘুড়ি দে একটা জলদি।
এখন আর একটাও নেই। ৫০০+ আনা হয়েছিল। তখন সাধলাম নিলি না! আমরা অনুমানও করিনি এত লোক আসবে! ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই উনাকেও দিতে পারলাম না একটা!
উনি কি ঘুড্ডি মানে ঘুড়ির জন্য কান্নাকাটি করছিলেন?!
ব্যাপারটা সেরকমই।
তাজ্জব ব্যাপার। খুইল্যা ক দেহি!
নিঃসঙ্গ এই মহিলা ঘুড়ি উৎসবে এসে বেশ আনন্দেই মেতেছিলেন। এটা হচ্ছে শুধু ঘুড়ি উড়ানোর উৎসব। এতে আমাদের দেশি কায়দায় কোনো অপরিণামদর্শী প্যাঁচ লাগালাগি, কাটাকাটি বা বাকাট্টা‘র স্থান নেই। কিন্তু কোনো একজন ঘুড়িওয়ালা তার কড়া মাঞ্জামারা সুতোর টানে ইনার উড়ন্ত ঘুড়িটিকে বাকাট্টা করে দিয়েছে। সেই ভূপাতিত ঘুড়িহাতে তিনি এসেছিলেন অভিযোগ জানাতে।
ও... এই ব্যাপার! এর লাইগা ইমুন কান্দাকাটি?
না, ব্যাপার আরো আছে। ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানলে কয়েকমাস আগে তার বাড়িটি ভস্মিভূত হয়েছে। এরপর গেল মাসে তার স্বামী গত হয়েছেন। আর আজ লংবিচের এই উন্মুক্ত সৈকতে অন্যায়ভাবে কেউ তার ঘুড়ি নিধন করে দিয়েছে!
দাবানলে বাড়ি পুড়ে যাওয়া আর স্বামীর মৃত্যু- এই দুই বিপর্যয়ে কোনো ব্যক্তির সরাসরি হাত ছিল না। কিন্তু ঘুড়িটাকে ধরাশায়ী করার পেছনে তো ছিল কোনো মানুষের ক্রীড়াচ্ছলে করা নিষ্ঠুরবৃত্তি!
ভুক্তভোগীর দৃষ্টিতে এটা একটা ক্রাইম যার জন্য বেপরোয়া ঘুড়িচালকের শাস্তি হওয়া উচিত!
হায় খোদা! ঘটনার শিকড় বা আগা এত যে গভীরগামী তা তো বুঝতে পারিনি...
হ্যাঁ দোস্ত। এটা আমেরিকা। ঘুড়ি কেটে দেওয়ার বিষয়টা তার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পড়ে।
শাওন বলে চলে- আমি তাকে বললাম যে বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশে ঘুড়ি-কাটাকাটি আর প্যাঁচ লাগানো একটা জনপ্রিয় ক্রীড়া।
হাঁ, ঘুড়ি ছাড়াও যে কোনো বিষয়ে কারণে-অকারণে প্যাঁচ লাগালাগিতে আমরা ওস্তাদ। ছোট্ট করে লোকমা ধরে দেই বন্ধুকে।
শাওন বলে- কিন্তু উনি বুঝতে চাইছিলেন না। শেষ পর্যন্ত মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে নরম নরম কথা বলে বিদায় করলাম খালাম্মাকে।
হুম, সেটা তো দেখতেই পেলাম। ঘটনার শেষ কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও-ও করেছি। উনার কান্নাকাটি বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল।
তিনটি আঘাতই তার কাছে কোনোটার চেয়ে কোনোটা কম না!
মনে পড়ে যায় কিশোর বয়সেই অতি পেকে যাওয়া এক মিনি দার্শনিক বন্ধুর কথা। সে বলেছিল-
বুঝলি! প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ দুঃখটাই তার কাছে বড়।
আমি বুঝে না বুঝে প্রশ্ন হাঁকি- মানে?
মানে আবার কি! দুঃখটা আসলে হচ্ছে পুরুষ মানুষের ‘ইয়ে‘র মতো- সবাই নিজেরটাকেই অন্য সবার চেয়ে বড় মনে করে।
চল্লিশ বছর আগে ইঁচরে পাকা বন্ধুর এই মন্তব্য এক্ষণে তিক্ত হাসি এনে দেয় ঠোঁটে। আমি শাওনের দিকে না তাকিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলতে থাকি-
হ, কথা ঠিকই কইছিল হালায়। এই যেমন হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে বোমায় গুলিতে হত্যা করেও এখনো নিজের ব্যর্থতা-দুখ ভুলতে পারছেনা নেতানিয়াহু।
এখন সারা দুনিয়ার তাবৎ তাকতদার, মানবতা আর গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালাদের মুখে কাঁচকলা ঠুঁসে দিয়ে তিনি প্রতিদিন স্রেফ ক্ষুধার যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করে চলেছেন ডজন ডজন শিশুকে। কারণ হামাসের কবল থেকে জিম্মিদের সবাইকে উদ্ধার করতে না পারার ব্যর্থতাজনিত দুঃখ তার অনেক গভীরে। আবার হামাসওয়ালাদের দুঃখের গভীরতাও বে-লাগাম। চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত ৬০/৭০ হাজার স্বজাতি নিহত হলেও তাদের পরাধীন হয়ে থাকার দুঃখ এত মর্মস্পর্শী যে এ নিয়ে আর কোনো ছাড় দিতেও তারা প্রস্তুত নয়।
ওইদিকে মুসলমানদের সারা জাহানের মুরব্বী, পবিত্র দুই মসজিদের সেবক আরবরাজরা তাদের কোন দুঃখ চাপতে যে বছরের পর বছর মজলুম ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন হিটলারীয় জুলুম নিরবে মেনে নিচ্ছে তা বোধগম্য নয়।
অবশ্য এই ফিনফিনে সফেদ মখমলী মহামূল্য জোব্বাধারীরা ফিলিস্তিনিদের কী রক্ষা করবে! তারা নিজেরাই তো টন টন বোমা ফেলে লাখে লাখে গুলি ছুঁড়ে ঝাঁঝরা করছে গৃহযুদ্ধ কবলিত ইয়েমেনকে। হত্যা করেছে হাজার হাজার মুসলিমকে, নিষ্পাপ শিশুদেরকে। সেখানেও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি লাখখানেক শিশু।
এই সেই সৌদি শাসক পরিবার যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার-ধর্ষক-গণহত্যাকারী পশ্চিম পাকিস্তানের জালিমদের পক্ষ নিয়েছিল। নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ বিশেষ করে মজলুম মুসলিমদের বিরুদ্ধে এদের কোন গভীর দুঃখ লুক্কায়িত আছে কে জানে! ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম, রাজনৈতিক দাবার চালে বৃটিশ-ফরাসি মদদে সাম্রাজ্যবাদী ওসমানীয় শাসনের কবলমুক্ত হয়ে যে মুক্তভূমিতে গঠিত প্রধান আরব রাষ্ট্রটির নাম হওয়া উচিৎ ছিল মোহাম্মদিয়া আরাবিয়া- বাস্তবে তা না হয়ে নবীর দেশের নাম হয়েছে দস্যু মনোবৃত্তি চালিত একটি পরিবারের নামে!
চীনের উইঘুরে, কাশ্মিরসহ ভারতের সর্বত্র যখন মোটাদাগে নির্মম মুসলিম নিপীড়ন-নিধন চলে তখন সম্পদশালী ক্ষমতাবান আরব দেশটি একই অঞ্চলে তার অনুগত দেশগুলোসহ স্পিকটি নট ভূমিকায় মূর্ত বা বিমূর্ত হয়। কিন্তু কেন? বৃহত্তর মুসলিম জাতির ওপর এমন নির্বিচার গণহত্যা, অন্যায়-অনাচার কোন দুঃখে মুখ বুঝে সয় তারা!
আবার আরবভূমিতে চেপে বসা এই ভ্রাতৃঘাতী শাসককূলের সীমাহীন অবিমৃশ্যকারীতা আর উম্মাহর বিভিন্ন সংকটকালে নববধূর মতো চুপটি করে দাঁতে নখ খুঁটতে থাকা শেখদের সমালোচনায় মুখে রা-টি কারেন না সবুজ শ্যামল বাংলায় মসজিদের এই শহরের কোনো শায়খুল হাদিস, কোনো মাদানি, কোনো আজহারি, কোনো ইসলামাবাদী! কী দুঃখ তাদের?!
এখানে তাদের স্বার্থের কোন ঘুড়ি বাকাট্টা করে দিয়েছে ফিলিস্তিনের, ইয়েমেনের, উইঘুরের, কাশ্মিরের নিপীড়িত নির্যাতিত অসহায় মানুষগুলো! নাকি ট্রাম্প-পুতিন-শি-মোদি তাঁদের টুঁটি চেপে ধরে রেখেছে? এই ব্যাপারে ইতিকর্তব্য নির্ধারণে হুজুরদের জন্য দিক নির্দেশনামূলক কোনো হাদিস আছে কী?
একটা নিছক ঘুড়ির জন্য ওই আমেরিকান মায়ের যে কষ্ট তার তিল পরিমাণ তারা অনুভব করেন কি ইয়েমেন-ফিলিস্তিনের লাখো শিশুদের জন্য!
এর কোনো উত্তর কি কারো কাছে আছে!?
লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী কথক।