• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

বৃষ্টির পানি: গুণে ভরা প্রকৃতির সেরা উপাদান

বৃষ্টির পানি: গুণে ভরা প্রকৃতির সেরা উপাদান

প্রতিকী ছবি

ফিচার ডেস্ক

আষাঢ়ের আকাশ এখন নেই। ঋতুচক্রে আশ্বিন এসেছে। প্রবাদ আছে, আশি^নে নাকি গহীন বৃষ্টিপাত হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এবছর বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তবে সামনের কয়েক সপ্তাহ দেশে তুমুল বৃষ্টিপাত হতে পারে। বৃষ্টির পানি ও বৃষ্টি নিয়ে সাহিত্য, কবিতা, প্রেম-প্রণয়ের দারুণ মিশেল রয়েছে। আবহমান বাংলার প্রকৃতি আর বৃষ্টির শীতল দানার কোমল পরশের অনুভূতি মানুষকে যেন সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। স্মৃতির করিডোরে বৃষ্টির আনাগোনা সবার জীবনেই আছে।

কিন্তু আমরা আজ, বৃষ্টি নিয়ে সাহিত্য, কবিতা কিংবা গানের অবতারণা করব না। প্রিয় পাঠক, বৃষ্টির পানি মানবদেহের জন্য কতটা নিরাপদ ও উপকারি, তা নিয়েই আমাদের এই আয়োজন। চলুন দেখে নেয়া যাক বৃষ্টির পানিতে কি আছে।

অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বৃষ্টির পানি পান করা সবচেয়ে নিরাপদ। মাটি অথবা পাথরে থাকা মিনারেলস আর বর্জ্য, বৃষ্টির পানিতে থাকে না। সেকারণে বৃষ্টির পানি চোখ বন্ধ করে পান করা যায়।

উপকারিতা

হজম শক্তি বাড়ায়: বৃষ্টির পানিতে রয়েছে অ্যালকালাইন। যা অ্যাসিডিটি কমিয়ে হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া অ্যালকালাইন ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ করে। ক্যান্সার রোগীদেরে ক্ষেত্রে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কাজ করে বৃষ্টির পানি।

রাসায়নিক মুক্ত পানি: ট্যাপের পানি জীবাণুমুক্ত করতে ক্লোরিন ব্যবহার করা হয়। আর ফ্লোরাইড আসে মাটির নিচ থেকে। বেশি মাত্রায় ক্লোরিন বা ফ্লোরাইড পেটে গেলে গ্যাসট্রাইটিস, মাথা ব্যথার মতো সমস্যা বাড়ে। বৃষ্টির পানিতে ফ্লোরাইড বা ক্লোরিন, কোনওটিই থাকে না।

কানের সমস্যা দূর করে: বৃষ্টির পানি কানের ব্যথা ও ইনফেকশন দূর করতে ব্যাপক কার্যকরী।

ব্যাকটেরিয়া নাশক: বৃষ্টির পানি মানবদেহের কোষে জমে থাকা খারাপ ব্যাকটেরিয়া দূর করে। এতে ত্বকের জ্বালাও দূর হয়।

চুল সুন্দর করে: বৃষ্টির পানিতে আছে প্রাকৃতিক অ্যালকাইন, যা মাথার ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং ময়লা দূর করে। এতে চুলের গোড়া মজবুত হয়। তাই বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ফলে চুলের রুক্ষতা কমে এবং অধিক উজ্জ্বল দেখায়। এ ছাড়া এই পানি খুশকিও দূর করে।

ত্বকের জন্য উপকারী: বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুন্দর সুস্থ ত্বক পেতে হলে, বৃষ্টির পানি অত্যন্ত উপযোগী। সুগন্ধি সাবান ত্বককে রুক্ষ ও প্রাণহীন করে দেয়। বৃষ্টির পানিতে সাবানের মতো অ্যাসিডিক উপাদান নেই।

বৃষ্টির পানি কি আসলেই নিরাপদ

বিশুদ্ধ ও পানযোগ্য পানি হিসেবে যেসব উৎস বিবেচনা করা হয়, সেগুলোর অন্যতম বৃষ্টির পানি। অস্ট্রেলিয়ার একদল গবেষক সেরকমই বলেছেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের আরেকটি দল বলছেন ভিন্ন কথা। সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণা সাপেক্ষে জানিয়েছেন, পৃথিবীর সব প্রান্তে বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিকর পিএফএএস রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে। আর এই রাসায়নিকের মাত্রা এমন মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে, যা আর পানের জন্য নিরাপদ নয়।

পিএফএএসকে ‘ক্ষতিকর রাসায়নিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, এই রাসায়নিক পদার্থ সহজে নষ্ট হয় না। প্যাকেজিং, শ্যাম্পু, মেকআপে প্রাথমিকভাবে এই রাসায়নিক পাওয়া গিয়েছিল। এসব উপাদান থেকে এই রাসায়নিক পানি ও বাতাসে ছড়িয়েছে।

এ নিয়ে বিস্তৃত একটি গবেষণা করেছেন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। এরপর এ-সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে। এই গবেষণা দলে ছিলেন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়ান কাসিনস। তিনি গবেষণাপত্রটি লিখেছেন। এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমরা যে মাত্রা নির্ধারণ করেছি, সেই অনুসারে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলের বৃষ্টির পানি আর নিরাপদ নয়।’

এই গবেষণার জন্য ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত নথি সংগ্রহ করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পিএফএএস এতটাই ক্ষতিকর রাসায়নিক যে এটা শিশুদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। এতে টিকাও ঠিকঠাক কাজ করে না। এ ছাড়া নারীর গর্ভধারণ ক্ষমতা, শিশু বেড়ে ওঠা ধীর হওয়া, স্থূলতা, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ক্যান্সারের জন্যও দায়ী এই রাসায়নিক।

বৃষ্টির পানি পানের ইতিকথা

ইতিহাস ও বিশ্বকোষ সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় খৃষ্টপূর্বের কোন এক সময় বালোচিস্তান (এখন পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানে অবস্থিত), এবং ভারতের কুচ প্রদেশের কৃষক সম্প্রদায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে। ওই পানি তারা কৃষি কাজে ব্যবহার করত।

এ ছাড়া প্রাচীন তামিলনাড়ুতে চোল সাম্রাজ্যের (১০১১-১০৩৭ খৃষ্টপূর্ব) রাজারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার শুরু করেন। ভারতের বালাগানপতি নগরের বৃহদেশ্বর মন্দিরের পানি শিব গঙ্গা ট্যাঙ্কে জমানো হতো বৃষ্টির পানি।

এমনকি ইতালির ভেনিস নগরিও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ওপর নির্ভর করত। ভেনিসের চারিদিকে যে উপহ্রদ রয়েছে, তার পানি লবণাক্ত এবং পানোপযোগী ছিল না। যে কারণে ভেনিসের প্রাচীন অধিবাসীরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের একটি ব্যবস্থা শুরু করেন, যা নির্ভর করত কৃত্রিমভাবে তৈরী কূপের ওপর।

 

তথ্যসূত্র: ড্রিঙ্ক হার্ট ওয়াটার, ওয়াটার কেইস ও উইকিপিডিয়া।

২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:৫৬এএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।