• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির কঠিন পথচলা: সাবেক ছাত্রনেতার বর্ণনা

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির কঠিন পথচলা: সাবেক ছাত্রনেতার বর্ণনা

তাহাজীব হাসান

সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান যুবদল কেন্দ্রীয় নেতা সর্দার এম জাহাঙ্গীর হোসেন। ছাত্রজীবনে তিনি হামলা, নির্যাতন, বহিষ্কার ও গুমের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও রাজনীতি থেকে সরে আসেননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

ছাত্রদলের নেতৃত্ব থেকে শুরু করে চীনে রাজনৈতিক অর্থনীতি ও কূটনীতি বিষয়ে পড়াশোনা পর্যন্ত তাঁর পথ ছিল সংগ্রামমুখর। শিক্ষার্থীদের সেবাকে ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য মনে করে তিনি। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। ইত্যাদি নানা বিষয়ে দৈনিক আমারাই বাংলাদেশের সাথে কথা হয় সর্দার এম জাহাঙ্গীর হোসেনের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাহাজীব হাসান

তাহাজীব: আপনার ক্যারিয়ার সম্পর্কে বলুন।

জাহাঙ্গীর: ধন্যবাদ। আমি দীর্ঘদিন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল শাখার সাধারণ সম্পাদক, পরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক, কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশনায় সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মাধ্যমে চীন সরকার ও চায়না কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে Political Economy, Diplomatic Relationship and Leadership বিষয়ে পড়াশোনা করি। ওই কোর্সে বিশ্বের ৬২টি দেশের তরুণ রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তারা অংশ নেন, এবং আমি নেতৃত্ব বিষয়ে সর্বোচ্চ ৯৮% নম্বর পেয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছ থেকে সম্মানসূচক সনদ অর্জন করি।

ছাত্র রাজনীতির কঠিন সময়

তাহাজীব: আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন এক কঠিন সময়ে। সেই সময়কার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন?

জাহাঙ্গীর: ছাত্র রাজনীতির পথ কখনোই সহজ ছিল না। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন। সেই সময় থেকে বিরোধী মতের ওপর দমন-নিপীড়ন শুরু হয়। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের হল শাখার সাধারণ সম্পাদক। আমরা হলে বৈধভাবে ছিলাম। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালায়, মারধর করে হল থেকে বের করে দেয় এবং হল দখল করে নেয়।

হল থেকে বের হয়ে আমরা আশেপাশে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক বাড়িওয়ালা  আমাদের বাসা ভাড়া দিতে চাননি। অবশেষে এক বন্ধুর ঝুঁকি নিয়ে তার রুমে আমাকে থাকতে দেয়। সেখানেও ছাত্রলীগের হামলা করে। আমাদের ল্যাপটপ-কম্পিউটার ভেঙে ফেলা হয়।

একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সুরমা এলাকার একটি বস্তিতে আশ্রয় নিই। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আমি প্রায় প্রতিদিনই সেখানে রাত কাটাতাম। ওই বস্তির পরিবেশ খুবই খারাপ ছিল—অপরিষ্কার পানি, পোকামাকড়ের যন্ত্রণা, স্যাঁতসেঁতে ঘর। এর কারণে আমার দাঁত নষ্ট হয়ে যায় এবং শারীরিক সমস্যাও হয়। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর বক্স আমাকে সাহায্য করেছিলেন, তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

হামলার অভিজ্ঞতা

তাহাজীব: আপনার ওপর তো একাধিকবার হামলা হয়েছে। সে ঘটনাগুলো সম্পর্কে বলুন।

জাহাঙ্গীর: হামলার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। কয়েকটি উল্লেখ করি।

  • ২০১০ সালে: ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকভাবে যেতে গিয়েও ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমাকে ও আমার সহকর্মীদের বেধড়ক মারধর করা হয়। কয়েকজন শিক্ষক হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু প্রশাসন কোনো বিচার করেনি। বরং উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
  • ২০১২ সালে: মদিনা মার্কেট এলাকার একটি মেসে থাকতাম। গভীর রাতে ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং কিছু শিক্ষকের সরাসরি ইন্ধন দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এই হামলায় এক ছাত্রের আঙুল কেটে যায়। এই ঘটনার প্রতিবাদে আমরা তিন দিনব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ডাকি, যা হাসিনা সরকারের আমলে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মঘট।
  • ২০১৩ সালে: আবারও সুরমা এলাকায় আমার ওপর হামলা হয়। সেদিন অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই।
  • ২০১৪ সালের পর: আরও কয়েক দফা হামলা হয়। বিশেষ করে সুরমা এলাকার চায়ের দোকান ও সেলুনের কাছে আমাকে রামদা নিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছিল। আশপাশের মানুষ ও সেলুনের কর্মীরা সাহায্য না করলে হয়তো আমি আজ বেঁচে থাকতাম না।

এগুলো ছাড়াও নানা সময়ে নির্যাতন চলতে থেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবরই নিরপেক্ষ না থেকে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের প্রভাবে আমাদের দমন করেছে।

পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হওয়া

তাহাজীব: আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সম্পর্কে বলুন?

জাহাঙ্গীর: ২০০৮ সালের পর থেকে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিকভাবে ক্লাস করতে পারিনি। নির্যাতন, মামলা, হামলার কারণে পড়াশোনা ব্যাহত হয়। মাস্টার্সের শেষ কয়েকটি ক্রেডিট থাকা অবস্থায় আমাকে বহিষ্কার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আমার সার্টিফিকেট withheld করে রাখে। কেবল ছাত্রদল করার ‘অপরাধে’ আমি পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি। শুধু আমি নই—আমাদের অনেক সহকর্মীও একইভাবে সার্টিফিকেট পাননি।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রতি নির্দেশনা

তাহাজীব: এখনকার শাবিপ্রবি ছাত্রদল নেতাকর্মীদের জন্য আপনার নির্দেশনা কী?

জাহাঙ্গীর: আমি সবসময় বিশ্বাস করি, ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সেবা করা। আমার সময়ে চেষ্টা করেছি ছাত্রদলকে মাদক বা অন্যায় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে। পড়াশোনার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছি।

আজকের ছাত্রদলের প্রতি আমার নির্দেশনা হলো—

  1. সাধারণ শিক্ষার্থীর সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা।
    যেমন—আবাসন সংকট, পরিবহন সংকট সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করা।
  2. গবেষণামূলক কাজে সহায়তা করা।
    আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলকে গবেষণা ও উন্নয়নমুখী কাজে সম্পৃক্ত করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সহায়তা করতে হবে।
  3. খাবারের মান উন্নয়ন করা।
    হলের ক্যান্টিনে পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
  4. আন্দোলন সংগ্রামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ানো।
    গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়া ও জনকল্যাণমূলক কাজে সক্রিয় থাকতে হবে।

শাকসু নির্বাচন নিয়ে মতামত

তাহাজীব: শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শাকসু নির্বাচন নিয়ে আপনার মত কী?

জাহাঙ্গীর: শাকসু নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, তখন কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। কিন্তু এখন দেশে পরিবর্তন এসেছে। ঢাকসু, জাকসু, রাকসু সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন এগিয়ে আসছে। তাই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাওয়া উচিত। আমি বিশ্বাস করি, প্রশাসনকে অবশ্যই শাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা

তাহাজীব: আপনি তো রাজনীতির পাশাপাশি চীনে উচ্চশিক্ষাও নিয়েছেন। সেটা সম্পর্কে কিছু বলবেন?

জাহাঙ্গীর: হ্যাঁ। চায়না কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে Political Economy, Diplomatic Relationship and Leadership বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। সেখানে Belt and Road Initiative সম্পর্কেও গবেষণা করেছি। বিশ্বের ৬২টি দেশের তরুণ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল।

তবে দেশে ফিরে আসার পর আমাকে দু’বার গুম করা হয়—২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এবং অক্টোবরে। কয়েকদিন অজ্ঞাত স্থানে রেখে আবার ছেড়ে দেওয়া হয়। এসব অভিজ্ঞতা কষ্টদায়ক হলেও আমি দলের প্রতি অনুগত আছি। আমার ব্যক্তিগত প্রতিকার চাই না। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্যায়ের বিচার হোক—এটাই প্রত্যাশা। আমি বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র ফিরে আসলে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত অর্থে শিক্ষার পরিবেশ পাবে।

আমি চাই, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হোক। আর ছাত্রদলের নেতারা যেন সাধারণ শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ান—এই আমার প্রত্যাশা।

তাহাজীব: আপনাকে ধন্যবাদ।

জাহাঙ্গীর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

 

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:২৭পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।