• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

বনলতা সেন কে ছিলেন, নারী নাকি পুরুষ?

বনলতা সেন কে ছিলেন, নারী নাকি পুরুষ?

প্রতিকী ছবি

ঐশি আলম পৃথ্বি

“বনলতা সেন”- জীবনানন্দ দাশ রচিত অন্যতম বিখ্যাত একটি গীতিকবিতা। ১৮ পঙক্তির এ সাহিত্যকর্ম হয়তো কবির চেয়েও বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে কবি বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায়। কিন্তু আজ প্রায় ৮৬ বছর পরেও একটি প্রশ্ন বারবার পাঠকের মনে কড়া নাড়ছে, বনলতা সেন আসলে কে ছিলেন? সত্যিই কি এমন কোন চরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছিল কবি জীবনে?

ঘনকালো চুলের বর্ণনা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য, পাখির নীড়ের মতো চোখের বর্ণনায় ধরেই নেয়া হয় তিনি একজন নারী ছিলেন। যদিও এমন সুন্দর চোখ বা মুখ পুরুষেরও হতে পারে। শুধুমাত্র তাই নয় এখানে কোন অলংকার বা পোশাকের কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাই শুধুমাত্র শারীরিক বর্ণনা থেকে বনলতা সেনকে নারী চরিত্রে আখ্যায়িত করা যেন কিছু খোঁড়া যুক্তিকেই নির্দেশ করে।

বনলতা কে ছিলেন এ প্রশ্নোত্তর পাঠক এবং লেখক মহলেও সব সময়ই আছে। বনলতা সেন আসলে কে ছিলেন এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রচলিত গল্পও পাওয়া যায় ।

একটি গল্প অনেকটা এরকম - জীবনানন্দ দাশ একদিন ট্রেন এ করে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে নাটোরে যখন ট্রেন থামে ভুবন সেন নামে এক বৃদ্ধের সাথে তার অপরুপা সুন্দরী এবং বিধবা বোন ট্রেনে উঠে। পরবর্তীতে বৃদ্ধ ঘুমিয়ে পড়লে সেই সুন্দরী বোনের সাথে আলাপ-পরিচয় এবং গল্প জমে উঠে কবির। সেই নারীর নাম ছিল বনলতা সেন।

আরোও একটি প্রচলিত গল্পে পাওয়া যায়, জীবনানন্দ দাশ একবার নাটোরে একজন রাজার নিমন্ত্রণে রাজবাড়ীতে গিয়েছিলেন। সেখানে বেশ ক'জন নারী তাঁর আপ্যায়নের জন্য নিয়োজিত ছিল। তাদের মধ্যে একজন সুন্দরীর প্রতি কবির গভীর মমতা জেগে উঠে। তাকে নিয়ে কবিতা লিখতে চাইলে তিনি অনুরোধ করেন তার নামে কবিতা না লিখে অন্য কোন নামে লিখতে। তখন কবি বনলতা সেন নামে কবিতা লিখেন।

গোপালচন্দ্র রায় নামের একব্যক্তি জীবনানন্দ দাশকে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন, এই বনলতা সেন কে? যার কথা আপনি আপনার কবিতায় লিখেছেন? বনলতা সেন নামের সত্যি কেউ ছিল আপনার পরিচিত? কবি সেদিন কোনো জবাব না দিয়ে শুধুমাত্র একগাল মুচকি হেসেছিলেন।

তুমুল জনপ্রিয় এ কবিতা সম্পর্কে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন সদ্য প্রয়াত অর্থনীতিবিদ ও লেখক আকবর আলি খান। তিনি তাঁর “লিঙ্গ বৈষম্যের অর্থনীতি” বইয়ে এ কবিতাটির বিভিন্ন লাইন এবং ভৌগোলিক অবস্থানের বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন যে, বনলতা সেন ছিলেন একজন বারবনিতা বা রুপপোজীবি। আকবর আলী আকবর আলী খানের মতে তৎকালীন নাটোর শুধুমাত্র কাঁচাগোল্লার জন্য বিখ্যাত ছিল এমন নয় বরং উত্তরবঙ্গের নাটোরে একটা বড় অংশ জুড়ে রুপপোজীবিদের কেন্দ্র ছিল।
“দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন”, এ লাইন থেকে যেন কবির অভিসারকেই ইঙ্গিত করছে। “এতদিন কোথায় ছিলেন?”- বনলতা সেন স্বেচ্ছায় এই পেশাকে গ্রহণ করেননি বরং করেননি বরং জীবনের সংকটময় প্রতিকূল অবস্থা তাকে বাধ্য করেছে এই অবস্থায় নামার জন্য। এই প্রশ্ন যেন তারই বহিঃপ্রকাশ।

“সব পাখি ঘরে ফেরে”- বনলতাদের সাথে দু’দণ্ড সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দদের (বিবাহিত পুরুষদের) নিজের (স্ত্রীর) কাছে ফিরে আসতে হয়। “থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”- এ অন্ধকার প্রাকৃতিক নয়, এ অন্ধকার নিষিদ্ধ প্রেমের আনন্দ ও বেদনার প্রতীক।

এভাবেই ভৌগোলিক ব্যাখ্যা থেকে অর্থাৎ নাটোরকে এবং কবিতার অনন্য পঙক্তি থেকে আকবর আলি খান বনলতা সেনকে বারবণিতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। অবশ্য আকবর আলি খানের এই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহের মজুমদার ‘জীবনানন্দ’ নামক গ্রন্থে বনলতা সেন নামের এক নিবন্ধে বনলতা সেন সম্পর্কিত আকবর আলি খানের গবেষণা কাজকে বিরক্তিকর, স্থূল, এবং নান্দনিক ধ্যানধারণা-বিযুক্ত বলে মতামত দেন।

শুধু তাই নয়, অধ্যাপক মজুমদার তার বক্তব্যের স্বপক্ষে ১২ টি পয়েন্ট তুলে ধরেন প্রশ্ন আকারে এবং তার বিশ্লেষণ দেন। সেক্ষেত্রে আবু তাহের মজুমদারের নিজের ব্যাখ্যা হল, বনলতা সেন আসলে বরিশালের সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন মেয়ে। তাঁর বর্ণনা জীবনানন্দের কারুবাসনা উপন্যাসে রয়েছে। তিনি ছিলেন জীবনানন্দের পাশের বাড়ির একজন নারী।

তবে বিশিষ্টজনদের এত রকম প্রশ্নোত্তর বা বিতর্কের পর একটি প্রশ্ন থেকে যায়। তারা কি অশোক মিত্র লেখনীতে জীবনানন্দের নিজ জবানি সম্পর্কে অবগত নন ? নাকি বিষয়টি তাদেরকে ভাবায় নি?

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক অশোক মিত্র তার জীবনী গ্রন্থ “আপিলা-চাপিলা”তে বনলতা সেন কে ঘিরে একটি প্রবন্ধ রেখেছেন। তিনি এক নিভৃত সন্ধ্যায় কবির সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন “কে ছিলেন বনলতা সেন? সেইসঙ্গে এটাও জিজ্ঞেস করেছেন, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, না কি বনলতা সেন নামটি বেছে নেয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে?

দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনও জবাব না পেলেও। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন, সে-সমস্ত খবর প্রকাশিত হত। হয়তো ১৯৩২ সাল হবে, নয়তো তার পরের বছর, বনলতা সেন নামের এক রাজবন্দি রাজশাহী জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহী থেকে নাটোর তো একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাকস্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহোত্তর পর্বে অন্য পদবি ব্যবহার করতেন, তাঁর সামান্য আলাপ হয়েছিল। কবি নিজ জবানিতে এভাবেই বনলতা সেনের পরিচয় তুলে ধরেছেন।

এভাবে বিভিন্ন প্রচলিত গল্প এবং গবেষণার মধ্যে আজও অচেনা রয়ে গেছে “বনলতা সেন”। এখন পর্যন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বেই আটকে আছে গীতিকবিতার এক ঝলমলে চরিত্র। বনলতা সেনের আসল পরিচয় হয়তো জানা হবে, হয়তো হবে না।

 

লেখক-

ঐশি আলম পৃথ্বি

শিক্ষার্থী, গ্রীন ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:১৩পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।