• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেত্রী ‘ববিতা’, অজানা যত কথা

ঢাকাই চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেত্রী ‘ববিতা’, অজানা যত কথা

ফাইল ছবি

বিনোদন ডেস্ক

ফরিদা আক্তার পপি তাঁর আসল নাম। ৭০-এর দশকের অন্যতম সেরা অভিনেত্রী রুপালি পর্দায় পরিচিত ‘ববিতা’ নামে। গত ৩০ জুলাই ৬৯ বসন্ত পেরিয়েছেন কৃতী এই অভিনেত্রী। চিরসবুজ ববিতা আজও তাঁর অভিনয় দক্ষতা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে টিকে আছেন স্বমহিমায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বিকাশ ও উন্নয়নে যে কজন মানুষ বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন চিত্রনায়িকা ববিতা তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী এই অভিনেত্রী ব্যক্তিগত জীবনে খুবই পরিপাটি ও ছিমছাম থাকতে পছন্দ করেন। রাজধানী ঢাকার গুলশানে ববিতার বাড়িটি যেন তাঁর রুচিরই বহিঃপ্রকাশ।

একজন আধুনিক মানুষের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি চিত্রনায়িকা ববিতা। এই বয়সেও তিনি আকর্ষণীয়া স্মার্ট। পোষাক পরিচ্ছদে এখনো অনেক রুচিশীল। অবসর সময়ে বই পড়তে পছন্দ করেন ববিতা। পছন্দের বইপত্র জোগাড় করতে তিনি সবসময় মরিয়া।

৭০ ও ৮০র দশকের অনবদ্য এ নায়িকা অস্কারজয়ী আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পরিচালক সত্যজিত রায়ের অশনি সংকেত ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রশংসা পান এই অভিনেত্রী। ববিতা ৩৫০ টির বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি পরপর তিন বছর একটানা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৫৩ সালে বাগেরহাট জেলায় জন্ম নেয়া ববিতার বাবার নাম নিজামুদ্দীন আতাউর। তিনি একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। ববিতার মা বি.জে. আরা ছিলেন একজন চিকিৎসক। বাবার চাকরি সূত্রে ববিতার শৈশব কেটেছে বাগেরহাটে। তবে তাঁদের পৈতৃক বাড়ি যশোরে।

ববিতার শৈশব এবং কৈশোরের প্রথমার্ধ কেটেছে যশোর শহরের সার্কিট হাউজের সামনে রাবেয়া মঞ্জিলে। তিন বোন ও তিন ভাইয়ের মধ্যে বড়বোন সুচন্দা চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, বড়ভাই শহীদুল ইসলাম ইলেট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেজভাই ইকবাল ইসলাম বৈমানিক, ছোটবোন চম্পা চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং ছোটভাই ফেরদৌস ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। এছাড়াও অভিনেতা ওমর সানি তাঁর ভাগ্নে এবং অভিনেত্রী মৌসুমী তাঁর ভাগ্নে বউ (ওমর সানীর স্ত্রী)। এ ছাড়া চিত্রনায়ক রিয়াজ তাঁর চাচাত ভাই। চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান ববিতার ভগ্নিপতি। ববিতার একমাত্র ছেলে অনীক কানাডায় পড়াশোনা করেন।

ববিতা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চলচ্চিত্রে পা রাখার পেছনে তাঁর বড়বোন সুচন্দা তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। ১৯৬৮ সালে জহির রায়হানের ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে রাজ্জাক-–সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর প্রাথমিক নাম ছিলো ‘সুবর্ণা’।

কথিত আছে জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ফরিদা আক্তার পপির নাম হয়ে যায় ‘ববিতা’। ১৯৬৯ সালে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায় প্রথম নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন ববিতা। ৭০’-এর দশকে শুধুমাত্র অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি গোটা দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৭৩ সালে ২৩তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে গোল্ডেন বীয়ার জয়ী সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রশংসিত হন এই কৃতী অভিনেত্রী। ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন ববিতা। এ ছাড়া ২০১৬ সালে তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়।

শিক্ষাজীবন

ববিতা পড়াশোনা করেছেন যশোর দাউদ পাবলিক বিদ্যালয়ে। সেখানে অধ্যয়নকালে বড়বোন কোহিনুর আক্তার চাটনীর (সুচন্দা) চলচ্চিত্রে প্রবেশের সূত্রে পরিবারসহ তিনি ঢাকায় চলে আসেন। রাজধানীর গেন্ডারিয়ার বাড়িতে শুরু হয় কৈশোরের বাকি দিনাতিপাত। পরে গেন্ডারিয়া স্কুলে পড়াশুনা শুরু করেন ববিতা। চলচ্চিত্রে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট অর্জন না করলেও ববিতা ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে শিক্ষিত করে তুলেছেন ধীরে ধীরে।

ববিতার চলচ্চিত্র কর্মজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একই নামের একটি অসমাপ্ত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘অশনি সংকেত’। ১৯৭৩ সালের এই চলচ্চিত্রে ‘অনঙ্গ বৌ’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীর মর্যাদা লাভ করেন। ১৯৯৩ সালে ভারতে বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, ১৯৭৩ সালে ভারতে বাংলা চলচ্চিত্র প্রসার সমিতি পুরস্কার এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি কর্তৃক বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেন ববিতা।

১৯৭৫ সালে ববিতা ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খ্যাতির চূড়ায় আরোহন করেন। মোহসীন পরিচালিত বাঁদী থেকে বেগম ছবিতে একজন কচুয়ানের ঘরে লালিত পালিত হওয়া জমিদারের কন্যা চাঁদনী চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। এই চলচ্চিত্রে একধারে কচুয়ানের মেয়ে, নর্তকী এবং জমিদারের কন্যা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি ১৯৭৫ সালে প্রবর্তিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের প্রথম আসরে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন।

পরে নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘লাঠিয়াল’ ছবিতে তিনি বানু চরিত্রে অভিনয় করার সুবাদে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করেন। পরের বছর ফারুকের বিপরীতে অভিনয় করেন সূর্যগ্রহণ ও নয়নমনি সিনেমায়। বহুল আলোচিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমায় অভিনয় করে তৎকালে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। নয়নমনি ছবিতে নাম চরিত্র মনি ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য তিনি টানা দ্বিতীয়বারের মত শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৭৬ সালে রাজ্জাকের বিপরীতে জহিরুল হক পরিচালিত কি যে করি, ওয়াহিদের বিপরীতে বন্দিনী, এবং জাফর ইকবালের বিপরীতে এক মুঠো ভাত ছবিতে কাজ করেন।

১৯৭৭ সালের মার্চে মুক্তি পায় চিত্রনায়ক রাজ্জাক পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘অনন্ত প্রেম’। এই চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে রাজ্জাক-ববিতার গভীর চুম্বনের একটি দৃশ্য ছিলো, যা সেই সময়ে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিল। তবে চুম্বনের দৃশ্য বাদ দিয়েই চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া সেই চলচ্চিত্রটির জন্যই চিত্রায়িত হয়েছিল বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের প্রথম চুম্বন দৃশ্য। একই বছর তিনি ইলিয়াস জাভেদের বিপরীতে ইবনে মিজান পরিচালিত নিশান চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এছাড়া এই বছর তিনি কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ রচিত ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ অবলম্বনে নির্মিত ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৮৩ সালে ববিতা দূরদেশ নামক হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নিজ কর্মজীবনে এবং বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রথমবারের মতো বলিউডে পদার্পণ করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ববিতা পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। ১৯৯১ সালে তিনি চাষী নজরুল ইসলামের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৯২ সালে দিলীপ সোম পরিচালিত ‘মহামিলন’ চলচ্চিত্রে শাহানা মালিক চরিত্রে অভিনয় করেন ববিতা। ছবিটিতে প্রধান দুই ভূমিকায় অভিনয় করেন সালমান শাহ ও শাবনূর।

১৯৯৬ সালে তিনি প্রযোজনা করেন ‘পোকামাকড়ের ঘর বসতি’। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন রচিত একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি পরিচালনা করেন আখতারুজ্জামান। ববিতা এই ছবিতে অভিনয়ও করেন। তার বিপরীতে ছিলেন খালেদ খান এবং খলচরিত্রে অভিনয় করেন আলমগীর। ছবিটির জন্য ববিতা শ্রেষ্ঠ প্রযোজক হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

২০০৯ সালে তিনি রাজ্জাকের বিপরীতে কৃতী এই অভিনেত্রী অভিনয় করেন ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’ সিনেমায়। ২০১০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ছোটগল্প সমাপ্তি অবলম্বনে নির্মিত ‘অবুঝ বউ’ ছবিতে অভিনয় করেন ববিতা।

ববিতা প্রায় তিন দশক ধরে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা। এক পর্যায়ে সিনেমার জগতে টিকে থাকার জন্য এবং বাণিজ্যিক ছবিতে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের জন্য তিনি পুরোপুরি বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতে বিনিয়োগ শুরু করেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাই ববিতা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম।

গ্রামীণ কিংবা শহুরে চরিত্র, সামাজিক কিংবা অ্যাকশনধর্মী যেকোনো সিনেমায় ববিতা সবসময় ফিট। ফ্যাশন সচেতন ববিতাকে অনেকেই রুচিবোধের কারণেই অনুসরণ করতেন।

১৭ আগস্ট ২০২২, ০৯:২৬পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।