• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১

হিরোশিমার স্মৃতি নিয়েও যেভাবে বিশ্বে অনন্য জাপানিরা

হিরোশিমার স্মৃতি নিয়েও যেভাবে বিশ্বে অনন্য জাপানিরা

ছবি- সংগৃহিত

ফিচার ডেস্ক

যুদ্ধ বৈরিতা বাড়িয়ে দেয়। দেশের সঙ্গে দেশের, মানুষে-মানুষে বিভেদ জাগিয়ে দেয় যুদ্ধ। যুদ্ধের কোনো ইতিবাচক ইতিহাস নেই। কেবল প্রাণহানি, ধ্বংস আর পতনের বার্তা নিয়েই যুদ্ধ আসে। যুদ্ধে যারা আক্রান্ত হয়, তাদের মনে আক্রমণকারীকে নিয়ে ঘৃণা জন্মায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সেই ঘৃণা আরও বিস্তৃত হতে থাকে। ভারত-পাকিস্তান, উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউক্রেন-রাশিয়া, যুদ্ধ কীভাবে এসব দেশ ও তাদের মানুষগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু এমন একটি দেশ রয়েছে যারা যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ। তবুও তাদের মনে কোনো ক্ষোভ নেই। নেই কোনো ঘৃণা। যে দেশে একই দিনে ভয়ঙ্কর জোড়া অ্যাটোমিক বোমা ফেলা হয়েছিল। একই দিনে যে দেশে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল।

কিন্তু অবাক হবেন যে, সেই দেশটির কোনো নাগরিকের মনে আক্রমণকারী দেশ ও তাদের নাগরিকদের নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই। ঘৃণা নেই। বলছি জাপানের গল্প, জাপানিদের উদারতার গল্প।

ইতিহাস যা বলছে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করে আমেরিকা। প্রলয়ঙ্করি এক প্রভাব সৃষ্টি হয় শান্ত সফেদ হিরোশিমা নাগাসাকিতে। প্রশান্ত শহর মুহুর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। প্রায় হারায় দেড় লাখ মানুষ। ধ্বংসস্তুতে পরিণত হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকি।

জাপানিরা যা ভাবে

সাধারণত আক্রান্ত দেশ আক্রমণকারী দেশকে ঘৃণা করবে এটাই স্বাভাবিক। আক্রমণকারী দেশের মানুষের প্রতি আক্রান্ত দেশের নাগরিকদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকাটাও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু জাপানিরা তো আলাদাই। বিশ্বের সকল জাতিগোষ্ঠীর মাঝে জাপানিরা সব সময়ই ভিন্ন মানসিকতার। তারা ভিন্ন মানবিকতার। যে কারণেই, জাপানিরা যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন নাগরিকদের ঘৃণা করে না।

বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ‘জাপান’। হিরোশিমা-নাগাসাকির তিক্ত বেদনাদায়ক স্মৃতি পেছনে ফেলে আমেরিকা-জাপানের বন্ধুত্ব এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। অর্থনীতি, বৈশি^ক রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি সহ সকল খাতে অভিন্ন পথে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন ও টোকিও।

অধিকাংশ জাপানিরা মনে করে, হিরোশিমা-নাগাসাকির ঘটনার জন্য গোটা আমেরিকা ও আমেরিকানদের দায়ী করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা ওই ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য তৎকালীন মার্কিন নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রনেতাদের দায়ী করে থাকে।

বর্তমানে হিরোসিমা-নাগাসাকি

৭৮ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। বহু বছর আর যুদ্ধের মুখে পড়েনি জাপান। পরমাণু অস্ত্রের প্রতিক্রিয়াশীল গোঙানি এখন হয়তো কিছুটা কমে এসেছে হিরোশিমা-নাগাসাকিতে। আবারও শহর গড়ে উঠেছে। মানুষের বসবাস বেড়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন সবুজ বিস্তীর্ণ উদ্যান। যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে খেলে বেড়ায়। যেসব উদ্যানে এখন বয়স্করা শেষ বয়সের অলস সময় কাটায়। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে তৈরি করা হয়েছে মনোরম সব উদ্যান।

তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই কলঙ্কজনক স্মৃতিও মনে রেখেছে জাপান। ঘৃণা নয় বরং অভিনব কায়দায় হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসের স্মৃতি পুষে রেখেছে দেশটি। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে স্থাপন করা হয়েছে হিরোশিমা শান্তি মেমোরিয়াল মিউজিয়াম ও নাগাসাকি শান্তি মেমোরিয়াল মিউজিয়াম।

কী অবাক করার মতো ব্যাপার। জাপানিরা বলেই হয়তো অতিতের মারাত্মক বেদনাদায়ক স্মৃতি তারা ইতিবাচক ভাবেই স্মরণ করে চলেছে। পরমাণু অস্ত্রের মুখোমুখি হয়েও তারা কি অবলীলায় শান্তির বার্তা প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।

আর এ কারণেই হয়তো, পৃথিবী জাপান একটিই। এ কারণেই হয়তো জাপানিরা পৃথিবীর সবচেয়ে বন্ধসূলভ জাতি। বেঁচে থাকো জাপান।

০১ মে ২০২৪, ০৪:০৫পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।