• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
বাংলা সিনেমার কালজয়ী অভিনেত্রীর গল্প

রাউজানের শান্ত মেয়ে যেভাবে হলেন রুপালি পর্দার ‘শাবানা’

রাউজানের শান্ত মেয়ে যেভাবে হলেন রুপালি পর্দার ‘শাবানা’

বিনোদন ডেস্ক

আফরোজা সুলতানা রত্না। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামের এক শান্ত-শুভ্র মেয়ে। তার বাবা ফয়েজ চৌধুরী একজন টাইপিস্ট ছিলেন। আর মা ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। ১৯৫২ সালের ১৫ জুন জন্ম নেয়া আফরোজা সুলতানা রত্না খ্যাতি পেয়েছেন ‘শাবানা’ নামে। বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী অভিনেত্রীদের মাঝে শাবানা সেরাদের সেরা।

ছোট বেলা শিশু শাবানা রাজধানীর গেন্ডারিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু মাত্র ৯ বছর বয়সেই পড়াশুনার পর্ব চুকিয়ে ফেলেন তিনি। দেশসেরা চলচ্চিত্রকার এহতেশাম ছিলেন শাবানার বাবার খালাতো ভাই। পরিচালক এহতেশামের হাত ধরে মাত্র ৯ বছর বয়সেই চলচ্চিত্রে নাম লেখান ‘শাবানা’। ১৯৬২ সালে ‘নতুন সুর’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শাবানার রূপালি জগতে পদার্পন।

এরপর ১৯৬৭ সালে ‘চকোরী’ সিনেমায় চিত্রনায়ক নাদিমের বিপরীতে প্রধান নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন গুণী এই অভিনেত্রী। চিত্র পরিচালক এহতেশাম ‘চকোরী’ চলচ্চিত্রে রত্নার নাম ‘শাবানা’ রাখেন। এরপর থেকেই তিনি সিনেমাপ্রেমীদের কাছে ‘শাবানা’ হিসেবেই পরিচিত।

কর্মজীবন

রূপালি পর্দার ঝলমলে ক্যারিয়ারের ৩৬ বছরে ২৯৯টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন শাবানা। ৬০ থেকে নব্বই দশকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন এই সব্যসাচী অভিনেত্রী। ২০০০ সালে রূপালী জগৎ থেকে আকষ্মিকভাবে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে নায়িকা শাবানা অভিনয়ের সুবাদে নয় বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন। এ ছাড়া প্রযোজক হিসেবেও একবার এই কৃতিত্বপূর্ণ পুরষ্কার পেয়েছেন শাবানা। আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে ২০১৭ সালে।

প্রিয় দর্শক, আপনি কি জানেন, শাবানা ২৯৯টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ১৩০টি সিনেমায় তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন নায়ক আলমগীর। ৮০ ও ৯০ দশকে সিনেমায় ‘শাবানা-আলমগীর’ জুটির সফলতা ও জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে।

বরেণ্য চলচ্চিত্রকার ও নিজের চাচা এহতেশামের হাত ধরে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় শাবানার। এহতেশাম পরিচালিত ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। এই চলচ্চিত্রে এহতেশামের সহকারি আজিজুর রহমান শাবানাকে স্ক্রিপ্ট মুখস্থ, সংলাপ প্রদান ও ক্যামেরার সামনে দাড়ানোর হাতেকলমে শিক্ষা দেন।

‘নতুন সুর’ ছাড়াও ইবনে মিজান পরিচালিত ‘আবার বনবাসে রূপবান’ মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘ডাক বাবু’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন শাবানা।

৭০ এর দশকের শুরুতে কাজী জহির পরিচালিত মধু মিলন ও অবুঝ মন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শাবানা- রাজ্জাকের জুটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাসুদ পারভেজের প্রযোজনায় চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন শাবানা।

১৯৭৭ সালে সিরাজুল ইসলাম ভুঁইয়া পরিচালিত ‘জননী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এই গুণী অভিনেত্রী। আপনি কি জানেন, জাতীয় চলচ্চিত্র প্রত্যাখ্যান করার রীতি প্রথম চালু করেছিলেন শাবানা। শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেও শাবানাই প্রথম সেই পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

অভিনেত্রী হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা শাবানা ১৯৭৯ সালে প্রযোজনা শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে তার স্বামী ওয়াহিদ সাদিককে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এসএস প্রডাকশন্স। নিজের প্রযোজনায় নির্মাণ করেন ‘মাটির ঘর’ চলচ্চিত্র। আজিজুর রহমানের পরিচালনায় সিনেমাটিতে অভিনয় করেন শাবানা নিজেই। ‘মাটির ঘর’ সিনেমায় শাবানার বিপরীতে ছিলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক।

এ ছাড়া ১৯৮২ সালে ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘নাজমা’ ও ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন শাবানা। তুমুল জনপ্রিয়তা পান আমজাদ হোসেন পরিচালিত দুই পয়সার আলতা চলচ্চিত্রে চাচার সংসারে পালিত পিতামাতাহীন মেয়ে ‘কুসুম’ চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে।

বিখ্যাত বাংলা চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘নাজমা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেও তিনি অনন্য কৃতিত্ব স্থাপন করেন। এছাড়া ‘রজনীগন্ধা’, ‘লালু ভুলু’, ‘মা ও ছেলে’, ‘লাল কাজল’, ‘নালিশ’, ‘ঘরের বউ’, ‘সখিনার যুদ্ধ’ ও ‘নতুন পৃথিবী’, ‘চাঁপা ডাঙ্গার বউ’, ‘রাজলক্ষী শ্রীকান্ত’, ‘লালু মাস্তান’, ‘সারেন্ডার’, ‘অপেক্ষা’সহ অসংখ্য বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেন। পাশাপাশি স্বাধীনতাত্তোর ‘হিম্মতওয়ালী’, ‘বাসেরা’ ও ‘হালচাল’ নামের উর্দু সিনেমায় এবং রাজেশ খান্না পরিচালিত হিন্দি ‘শত্রু’ সিনেমায় ভিনয় করেও জনপ্রিয়তা পান শাবানা। ‘অপেক্ষা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৮৯ সালে মতিন রহমান পরিচালিত ‘রাঙা ভাবী’, ‘ব্যথার দান’, ও ‘সত্য মিথ্যা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। রাঙা ভাবী ছবিটি তার নিজের প্রযোজনা সংস্থা থেকে নির্মিত হয়। এতে তার সহশিল্পী ছিলেন আলমগীর ও শিশু শিল্পী তাপ্পু। সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯৯০ সালে আজহারুল ইসলাম খান পরিচালিত ‘মরণের পরে’, কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘গরীবের বউ’ ও স্বপন সাহা পরিচালিত ‘ভাই ভাই’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন শাবানা।

১৯৯০ এর দশকের প্রথম দিকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলেও শেষের দিকে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় শুরু করেন বরেণ্য অভিনেত্রী শাবানা। এরপর ১৯৯৭ সালে হঠাৎ করেই অভিনয়ের ইতি টানেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই সফল নায়িকা। তার অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র আজিজুর রহমান পরিচালিত ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’। সিনেমাটি ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায়। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে তার পরিবারের কাছে চলে যান এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

হঠাৎ করে শাবানার চলচ্চিত্র ছাড়ার ঘটনা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। কিন্তু প্রথম থেকেই এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাননি নায়িকা শাবানা ও তার পরিবার। তবে দীর্ঘ ১৯ বছর পর শাবানার স্বামী প্রযোজক ওয়াহিদ সাদিক জানিয়েছিলেন-‘শৈশব থেকে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল শাবানা। নিজেকে সে সময় দিতে পারেনি। তাই অভিনয় ছেড়ে এখন নিজের মত করে সে সময় কাটাচ্ছে।’

ব্যক্তিগত জীবন

১৯৭৩ সালে যশোরের কেশবপুর উপজেলার বাসিন্দা ওয়াহিদ সাদিকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নায়িকা শাবানা। ওয়াহিদ সাদিক একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন। শাবানার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এসএস প্রডাকশন্সের দেখাশোনা করতেন সাদিক। শাবানা-সাদিক দম্পতির দুই মেয়ে রয়েছে। তাদের নাম সুমি ও ঊর্মি। এছাড়া শাবানার একমাত্র ছেলের নাম নাহিন।

সম্মাননা অর্জন

অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে শাবানা দশবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে অভিনয়ের জন্য নয়বার ও প্রযোজক হিসেবে একবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০১৭ সালে আজীবন সম্মাননা পান শাবানা। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে প্রযোজক সমিতি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কার, আর্ট ফোরাম পুরস্কার, নাট্যসভা পুরস্কার, কামরুল হাসান পুরস্কার, নাট্যনিকেতন পুরস্কার, ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার ও কথক একাডেমি পুরস্কার।

শাবানা মস্কো ফ্লিম ফেস্টিভ্যাল, রুমানিয়া ফ্লিম ফেস্টিভ্যাল, কান ফ্লিম ফেস্টিভ্যালসহ আরো বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন।

ঢালিউডের এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানা এখন ইসলামী জীবনধারায় নিজেকে পরিচালিত করছেন। রূপালি পর্দার শাবানার সঙ্গে বর্তমান সময়ের বাস্তবের শাবানার যেন কোনোই মিল নেই। যশোরের কেশবপুরে রাজনৈতিক পরিবারের গৃহবধূ জনপ্রিয় চিত্র নায়িকা শাবানা এখন সামাজিক উন্নয়ন ও মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, সামাজিক সহায়তার কাজেই নিজেকে ব্যস্ত রাখেন।

১৪ আগস্ট ২০২২, ০৩:৩৬পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।