পুষ্টিগুণ ও উপকারিতায় অনন্য ‘বুনো কচু’
প্রতিকী ছবি
প্রখ্যাত বাউল সাধক লালন সাঁই বলে গেছেন- ‘খেয়েছি বেজাতের কচু না বুঝে, এখন তেঁতুল কোথা পাই খুঁজে’। বিখ্যাত এই পঙক্তির অর্থ এমন যে, কচু খেলে আপনি যদি বিপদে পড়েন, তবে তা থেকে রেহায় পেতে আপনাকে তেঁতুল বা টক জাতীয় কিছু খেতে হবে। তবে তেঁতুল না পেলেও বন কচু বা কচুর মুখির স্বাদ থেকে তো কেউ নিজেকে বঞ্চিত রাখবে না। কারণ, এই খাদ্য উপাদানটি অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও উপকারি।
প্রিয় পাঠক, চলুন দেখে নেয়া যাক বুনো কচু বা বন কচুর গুণাগুণ ও উপকারিতা-
পরিচয়
বন কচু আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় একটি খাবার। এর পাতা শাক হিসেবে খাওয়া যায়। এই কচুর মুখি বা লতি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সুস্বাদু। বন কচুর বৈজ্ঞানিক নাম Colocasia esculanta, Colocasia antiquorum বা Arum esculentum। এটি প্রধানত Araceae পরিবারভুক্ত একটি উদ্ভিদ। খাদ্য ও ভেষজ চিকিৎসায় এই কচুর পাতা ও কাণ্ড ব্যবহার করা হয়। প্রধানত গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে বন কচু বেশি জন্মে। আমাদের দেশেও এই কচু যত্রতত্র পাওয়া যায়।
যেভাবে খেতে পারেন বন কচু
পুষ্টিবিদরা বলছেন, বিশ্বে ৩০০ প্রজাতির বন কচু রয়েছে। এর মধ্যে ৮৭ টি প্রজাতি সনাক্ত করা হয়েছে। বন কচুর পাতা প্রথমে গরম পানিতে সেদ্ধ করে চিপে পানি ফেলে দিয়ে রান্না করা যায়। রান্না করার সময় মরিচ, লবন, তেল, হলুদ ছাড়াও বেশি করে রসুন ব্যবহার করতে হয়। অন্যথায়, গলা চুলকানোর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কচুর মুখি বা লতি রান্নার ক্ষেত্রে এতে নারিকেলের দুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
পুষ্টি উপাদান
জনপ্রিয় স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবজার্নাল হেলথ লাইন, ওয়েব এমডি ও উইকিপিডিয়ার তথ্য বলছে, বন কচুতে রয়েছে ভিটামিন, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, আয়রনসহ অন্যান্য খনিজ উপাদান। এ ছাড়া এতে রয়েছে শ্বেতসার এবং এমাইলোপেকটিনের মতো উপাদান। বন কচুতে বিশেষ করে রয়েছে, অক্সিলেটিক এসিড, ক্যালসিয়াম অক্সালেট এবং স্যাপোটকসিন।
প্রতি ১০০ গ্রাম বন কচুর পাতায় রয়েছে-
কার্বোহাইড্রেট- ৬.৮ গ্রাম,
প্রোটিন- ৩৯ গ্রাম,
আয়রন- ১০ মিলিগ্রাম,
ভিটামিন বি১- ০.২২ মিলিগ্রাম,
ভিটামিন বি২- ০.২৬ মিলিগ্রাম,
ভিটামিন সি- ১২ মিলিগ্রাম,
চর্বি- ৫ গ্রাম,
ক্যালসিয়াম- ২২৭ মিলিগ্রাম এবং
ক্যালরি- ৫৬ কিলোক্যালরি।
উপকারিতা
হেলথ লাইন, ওয়েব এমডি, রিসার্চ গেইট ও উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, বন কচু-
রক্তশূন্যতা দূর করে: কচুতে রয়েছে প্রচুর আয়রন, যা রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। যাদের রক্ত শূন্যতা আছে তারা নিয়মিত কচু অথবা কচুর পাতা খেতে পারেন।
আয়রনের ঘাটতি পুরণ করে: কচুতে রয়েছে পর্যাপ্ত আয়রন। ফলে নিয়মিত কচু শাক বা কচু খেলে আয়রনের ঘাটতি পুরণ হয়।
গর্ভবতীদের জন্য উপকারি: কচুর শাক বা কচু গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারি। এটি দামেও সস্তা। এতে থাকা ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন গর্ভবতী নারীর জন্য খুবই উপকারি।
পানি শূন্যতা দূর করে: কচুর ডাঁটায় রয়েছে পর্যাপ্ত পানি। ফলে কচুর ডাঁটা বা কচুর পাতা খেলে পানি শূন্যতা দূর হবে।
হজমশক্তি বাড়ায়: কচুর শাক ও কচুতে থাকা আয়রন, জিঙ্ক ও ভিটামিন দেহের মেটাবলিজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া কচুর শাকে থাকা ফাইবার হজমশক্তি বাড়াতে বিশেষভাবে কার্যকরী।
জ্বর সারায়: গবেষকরা বলছেন, জ্বরের সময় রোগীকে দুধ কচু রান্না করে খাওয়ালে জ্বর দ্রুত ভাল হয়। কারণ, এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, ফোলেট ও থায়ামিন। এসব উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে: কচু খেলে রক্তের কোলেস্টরল কমে। তাই উচ্চরক্ত চাপের রোগীদের জন্য কচু বেশ উপকারি।
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়: নিয়মিত কচু খেলে কোলন ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। এ ছাড়া কুচর শাক ও কচুতে থাকা আয়োডিন গলগণ্ড রোগ প্রতিরোধ করে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে: যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তারা বন কচুর লতি খেতে পারেন। কারণ এতে সুগার নেই বললেই চলে।
সতর্কতা
কচুতে রয়েছে অক্সলেট নামক উপাদান। তাই কচু শাক বা কচু খেলে অনেকের গলা চুলকায়। তাই কচু রান্না করার সময় লেবুর রস অথবা সিরকা ব্যবহার করুন। এ ছাড়া যাদের অ্যালার্জিজনিত সমস্যা রয়েছে, তারা কচু শাক বা কচু খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
তথ্যসূত্র- হেলথ লাইন, ওয়েব এমডি ও উইপিকিডিয়া।