নৌপথে ইতালি : ঢেউয়ে ঢেউয়ে মৃত্যুর গল্প শোনালেন যুবক!
প্রতিকী ছবি
স্বপ্ন পুরণে অনেকে বিদেশে পাড়ি জমান। কেউ কেউ আবার এক দেশ থেকে অন্যদেশেও চলে যান সুযোগ বুঝে। বিশেষ করে ইউরোপের আশেপাশের অনুন্নত দেশ থেকে উন্নত দেশে ঢুকে পড়ার ঘটনায় বেশি। তবে অধিকাংশ প্রবাসী বাংলাদেশি নৌপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয় ইতালি যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে থাকেন। যেখানে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে থাকে মৃত্যুর হাতছানি। তারপরও মানুষ জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নেন, কেউ সফল হন, কেউ দেশে ফেরেন লাশ হয়ে।
এমনই এক যুবক ইউসুফ মৃধা। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের হাসনাবাদ গ্রামের খোরশেদ মৃধার ছেলে তিনি। জীবিকার তাগিদে গিয়েছিলেন লিবিয়ায়। সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশের সময় ব্যর্থ হন। দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার পর ইউসুফ খালি হতে দেশে ফিরেছেন।
সম্প্রতি ইউসুফ মৃধার সঙ্গে নিজের ইতালি যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা ফেসবুকে শেয়ার করেছেন মোকতাদির ইসলাম নামের এক যুবক। তিনিও সৌদি আরব প্রবাসী।
মোকতাদির লিখেছেন- আমি আবার ফিরে এসেছি বাংলাদেশে। তবে আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায় আমার সহযাত্রী ও বন্ধুদের মৃত্যু। ২৫ জনের ধারণ ক্ষমতার বোটে সে দিন ওঠানো হয়েছিল ৩৭ জনকে।
মোকতাদির আরও লিখেছেন- ‘আমার বন্ধু ইউসুফ লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে প্রায় এক মাস নিখোঁজ থেকে গত বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন। সে এখন রাজধানীর হাজী ক্যাম্পে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। তার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা আমার কথা হয়েছে। সে যেভাবে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে সেটাই ফেসবুকে পোস্ট করেছি আমি।
মোকতাদির যা লিখেছেন- ‘২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় লিবিয়া থেকে আমাদের বোট ছাড়ে। আবহাওয়া ভালো ছিল না। বোটে ধারণ ক্ষমতা ছিল ২৫ জন। সেখানে দুই জন চালকসহ ওঠানো হয়েছিল ৩৭ জন। ডবল ইঞ্জিনের বোট দেওয়ার কথা থাকলেও বোটে ইঞ্জিন ছিল একটি। আমাদের কোনো সেফটি জ্যাকেটও দেয়নি। কারণ লাইফ জ্যাকেট দিলে যাত্রী কম ধরবে। লিবিয়া থেকে রাত ৮টায় যাত্রা শুরু করে ভোর ৩টার দিকে আমরা পৌঁছে যাই মাল্টার কাছাকাছি।’
‘এর মধ্যেই একজন বোট থেকে পানিতে পড়ে যান। সে বলছিল ‘আমাকে তোরা উঠাবি না?’ তখন আমরা সবাই বললাম ক্যাপ্টেনকে (নাবিক) তাকে নিয়ে নিতে। সাগর খুব উত্তাল থাকায় তাকে তুলতে গিয়ে বোট একদিকে কাত হয়ে যায় এবং বোটে পানি উঠতে শুরু করে। একপর্যায়ে আমাদের বোটটি উল্টে ডুবে যায়।’
‘তারপর আমরা তেলের গ্যালন ধরে সমুদ্রে ভেসে থেকে সাঁতার কাটতে থাকি। কিছুক্ষণ পর বোটটি একটু দূরে ভেসে ওঠে। আমরা ১৫-২০ জন উল্টে যাওয়া বোটটি ধরি দুপাশ থেকে। ওই সময় অন্ধকারের কারণে দেখা সম্ভব ছিল না সেখানে কে আছে আর কে নেই। এ অবস্থায় প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে ভাসতে থাকি কোনো ভাবে। এর মধ্যে আমাদের শরীর বরফ হয়ে আসছিল। ঢেউয়ের কারণে এক একজন ছুটে যাচ্ছে বোট থেকে। চোখের সামনে কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন। লবণাক্ত পানি খেয়ে ফেলায় কয়েকজনের মুখ দিয়ে রক্ত আসছিল। আস্তে আস্তে অনেকেই পানির নিচে চলে গেল।’
ইউসুফের সূত্রে মোকতাদির আরও লিখেছেন- ‘এমন করতে করতে প্রায় ১৩ ঘণ্টা কেটে গেল। ২৮ জানুয়ারি বিকেল হয়ে গেছে। তখন বেঁচে ছিলাম আমরা মাত্র সাত জন। তখন অনেক দূর দিয়ে একটি টহল কোস্টগার্ডের বোট যাচ্ছিল। তারা দেখতে পায় আমাদের এবং উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর সাত জন থেকে রাশিদুল নামে একজন মারা যায়। আমাদের ছয় জনকে অজ্ঞাত এক জেলখানায় তিন দিন রাখা হয়। তিন দিন পর আরেকটি জেলখানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে গত বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) স্থানীয় দূতাবাসের সহযোগিতায় দুজন দেশে ফিরেছি। অন্য চার জনও দ্রুতই দেশে ফিরবেন বলে শুনেছি।’
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন ইউসুফ।