‘ফাইজা’র মৃত বাবা বলছি : আমার লাশের দায় ওর নয়’
ছবি- নিজের মামার কোলে ছোট্ট ফাইজা। ছবিটি চট্টগ্রামের সংবাদকর্মী সুবল বড়ুয়ার ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহিত।
‘বাসা থেকে ডিপোতে যাওয়ার সময় রোজ আমার সোনামনি ফাইজাকে আদর করতে হতো। ছোট্ট ফাইজা আজ আমাকে ছাড়তেই চাচ্ছিল না। ও হয়তো আঁচ করতে পেরেছিল, ওর বাবা আর আজ বাসায় ফিরবে না। ফাইজার নিষ্পাপ হৃদয় হয়তো বুঝে নিয়েছিল আমি আর কোনো দিন তাকে কোলে তুলে আদর করব না। রাতে ডিপোতেই আছি। হঠাৎ আকষ্মিক বিস্ফোরণে চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। মুহুর্তেই আমার শরীরে আগুন লাগলো। ফাইজাকে যে হাত দুটো দিয়ে প্রতিদিন আদর করতাম, সেই হাত দুটো ক্রমশঃ ঝলসে যেতে লাগলো। আমি চিৎকার করে বাঁচার আকুতি জানিয়েও কাউকে পেলাম না। আশেপাশের কয়েকজনও মারা গেল। আমিও মারা গেলাম। কাউকে কিছু বলে যেতে পারিনি। স্ত্রী, সন্তান-স্বজন কাউকেই কিছু বলে যেতে পারিনি। আমার মৃত্যুর জন্য কাউকে দায় দিয়ে চিরকুটও লিখে যেতে পারিনি। কারণ, আমাদের মত মানুষের মৃত্যুতে কারও দায় থাকে না। বড় জোর আমার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাবে এই সমাজ।
আমি মারা যাওয়ার পর সমবেদনা জানানো শুরু হয়েছে। আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবারের কাছে মানুষ এসে সমবেদনা জানাচ্ছে। পত্রিকায়, টেলিভিশনে আমার মৃত্যুর খবরটাও যাচ্ছে, নামও দেখা যাচ্ছে। আমার নিথর দেহ এখন লাশ ঘরে। কিন্তু আমাকে কেউ চিনতে পারছে না। আমি কে, কি আমার নাম, কি আমার পরিচয়, সেটা এই সমাজ চিনতে পারছে না। চিকিৎসক, লাশ কাটা ডোম এমনকি আমার পরিবারের মানুষও আমাকে চিনতে পারছে না।
আমি লাশ কাটা ঘরের মেঝেতে পড়ে আছি। আমি মারা গিয়েছি তাতে কষ্ট নেই। আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছি, তাতেও কষ্ট নেই। কারণ আমাদের মতো মানুষদের মরলেই হলো, মরা টা আগুনে পুড়ে না পানিতে ডুবে সেটা কোনো বিষয় নয়। আমরা শ্রমিক, আমরা দিনমজুর, আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের মৃত লাশের দাম ৫০ হাজার আর পঙ্গু দেহের দাম ২০ হাজার।
আমার পাশে আরও কয়েকটা লাশ রয়েছে। সেগুলোর পরিচয়ও জানতে সমস্যায় পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমি লাশকাটা ঘরের মেঝেতে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া নিজের দেহে তখনও আমার ছোট্ট সোনামনি ফাইজা’র গন্ধ পাচ্ছি। হঠাৎ, আমার পুড়ে যাওয়া শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি টের পেলাম আমার পুড়ে যাওয়া শরীর থেকে রক্ত-মাংসের নমুনা নিচ্ছেন ডাক্তাররা। আমি চুপ করে পড়েই রইলাম মেঝেতে।
পরে ডাক্তারদের পরস্পরের কথা শুনে আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমি আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। তারপরও তারা আমার চিৎকার শুনলো না। আমি বারবার চিৎকার করে বলতে লাগলাম, দোহায় আপনাদের আমার লজ্জাবতী ‘ফাইজা’ মায়ের দেহ থেকে রক্ত নেবেন না। ওর ছোট্ট দেহে আপনার সুঁই ঢুকাবেন না।
আমি চিৎকার করে বলতে লাগলাম, আমার লাশের পরিচয় দরকার নেই। আমি আমার পরিবারের কাছে যেতে চাই না। তারপরও আমার ফাইজার দেহে আপনারা এতটুকু ব্যথা দেবেন না। আমি এমন মৃত্যু তো চাইনি, যে মৃত্যুর পর আমার পরিচয় শনাক্ত করতে আমার কলিজ্বার টুকরা মেয়েকে আনা লাগবে।
আমি যে রাসায়নিকের ডিপোতে কাজ করতাম, সেটা আমি আগুন লেগে মরার পরে জানতে পেরেছি। আমার অবুঝ মেয়েকে কেন আমার ভুলের জন্য কষ্ট ভোগ করতে হবে? আমি পেট বাঁচাতে মৃত্যুর দুয়ারে কর্ম বেছে নিয়েছিলাম। সেই দুয়ারেই আমার মৃত্যু হয়েছে, সেই দায় কেন আমার মেয়ে নেবে? আমি আমার পরিচয় শনাক্ত হোক চাই না। আমার মৃত দেহ শনাক্তের জন্য আমার ছোট্ট ময়না পাখি সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকে, আর আমি লাশকাটা ঘরের মেঝেতে নিথর দেহে শুয়ে আছি। এর চেয়ে বড় মৃত্যু আর কি হতে পারে।
ও সমাজের ধারক বাহকরা, ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা, আপনারা আমার লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে গিয়ে নিজেদের সময় নষ্ট করবেন না। আমার মতো মানুষেরা মারা গেলে আপনাদের তো চিন্তিত হওয়ার কথা নয়। আপনারা নিজেদের দায়িত্ববোধ ও দায়িত্বপরায়ণতা দেখাতে গিয়ে আমার দুধের বাচ্চাকে আর টানাটানি করবেন না। তার চেয়ে বরং আমার লাশ শনাক্ত না করাই থাক। পারলে আমার এই পুড়ে কয়লা হওয়া দেহটা কোথাও ফেলে রেখে আসুন।
ও কর্তাবাবু, আমার লাশ শনাক্তকরণে আপনাদের দায়িত্ববোধ দেখে আমার হাসি পাচ্ছে। আমার লাশ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে কি প্রাণান্তকর চেষ্টাটাই না করে যাচ্ছেন আপনারা। কিন্তু আপনারা আমার দুধের বাচ্চা ‘ফাইজা’র সামনে দাঁড়াতে পারবেন তো? ফাইজা যখন আপনাদের কাছে বলবে, ‘আমার আব্বু কই, আমার আব্বুকে এনে দেন, আব্বু কি একটু পরেই বাসায় আসবে?’। তখন আপনারা কি উত্তর দেবেন?
জানি আপনাদের উত্তর সবসময় প্রস্তুত থাকে। আপনাদের কাছে বিচারপ্রার্থী শিশু, নারী এমনকি কোনো মানুষও নিরাপদ নয়। এই সমাজে বিচার চাইতে গিয়ে মানুষ হেনস্থার শিকার হচ্ছে। কর্মহীনতার কারণে মানুষ উপায় না পেয়ে মৃত্যুকূপে কাজ করছে। রাষ্ট্র চাইলেই আমার মতো নিম্নশ্রেণির শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তা করবে না। রাষ্ট্র বরং তেলা মাথাওয়ালাদের নিয়ে টিকে থাক। আমার মতো মানুষ আগুনে পুড়ে কয়লা হলেও রাষ্ট্রের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার দুগ্ধপোষ্য শিশু তার বাবার লাশ শনাক্ত করতে হাসপাতালের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছে, এই দায়ও রাষ্ট্রের নয়। বরং রাসায়নিকের ডিপো যে ক্ষতিগ্রস্থ হলো, কিভাবে ওই ব্যবসায়ীকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া যায় রাষ্ট্র এখন সেই চিন্তায় বিভোর।
আমার এই কথাগুলো যিনি পড়ছেন, জ্বি, আপনাকেই বলছি। এই দেশে আমার মতো মানুষের মৃতদেহ শনাক্ত করা না করার কোনো ভালো খারাপ আছে? তার চেয়ে বরং আমার ছোট্ট শিশুটাকে যেন খাবারের অভাবে, শিক্ষার অভাবে, কাপড়ের অভাবে বেঁচে থাকতে না হয়, সেই চাওয়াটাই উচিত নয় কি? হে রাষ্ট্র, আমার লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে আমার সন্তানকে টানাটানি না করে বরং আমরা সন্তানের দায়িত্ব কে নেবে, কিভাবে আমার সন্তান, আমাদের মতো এরকম হাজারো মানুষের সন্তান এই দেশে নির্বিঘ্নে বেড়ে উঠবে সেই চিন্তা করুন।
হে সমাজ, আমার লাশের বদলে আমার পরিবারকে কথিত আর্থিক সুবিধা না দিয়ে বরং আমাকে এই নিশ্চয়তা দিন যে, আমার স্ত্রী-সন্তানকে যেন কখনো এদেশে হেনস্থার শিকার হওয়া না লাগে। আমার সন্তান যেন সাধারণ আর সব শিশুর মতোই বেড়ে উঠতে পারে।
আমি জানি, আমার এই আকুলতার কোনো মূল্যই আপনাদের কাছে নেই। বেশি হলেও আর দুদিন চলবে আমাদের লাশের খবরাখবর। তারপর দেশে নতুন কোনো ইস্যূ চলে আসবে। আমার লাশটা এই লাশকাটা ঘর থেকে হয়তো ফাইজা নিয়ে যাবে তার কাছে। কিন্তু তারপরও আমার কিছু প্রশ্ন থেকেই যাবে, রাজনৈতিক প্রভাবের শক্তিতে দেশে আইন অমান্য করে যত্রতত্র কারখানা, ডিপোসহ নানা ধরণের শিল্প প্রকল্প করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক শক্তিধর ব্যক্তিরা আর্থিক শক্তিতে আরও বলিয়ান হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত ছিল, শ্রমিকবান্ধব কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক নেতারা তা করছেন না। বরং ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, ধর্মগুরু, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাষ্ট্রের আমলা সবাই মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। সবার সুর একই সুরে গেঁথে আছে। যে কারণে আমার মতো, আমাদের মতো হাজার হাজার মানুষও পুড়ে অঙ্গার হলেও পরিবেশের পরিবর্তন হবে না।
আমি পরিবেশের পরিবর্তন দাবি করছি না। শুধু এটুকুই চাই, কোমলমতি ফাইজা’র মতো আর কোনো ফাইজাকে যেন তার বাবার লাশ শনাক্ত করতে নিজের ডিএনএ নমুনা দিতে না হয়। (ছোট্ট শিশু ফাইজা’র বাবার বক্তব্য হিসেবে লেখা উপরের অংশটুকু কাল্পনিক)।
প্রসঙ্গ: শনিবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ছোট্ট শিশু ফাইজা’র বাবা। সাত মাসের অবুঝ শিশু ফাইজা রবিবার চমেক হাসপাতালে ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছে মামার কোলে উঠে। এখনো পৃথিবীর আলো ভালো মতো না চিনলেও বাবার লাশের ভার নিজের কাঁধে বইতে এসেছে ফাইজা। সঙ্গে ছিলেন ফাইজার মা ইস্ফান সুলতানা। ঘটনাটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি করে।
ডিএনএ নমুনা দিতে আসা ফাইজা’র একটি ছবি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে চট্টগ্রামের সংবাদকর্মী সুবল বড়ুয়া তাঁর ফেসবুক ওয়ালে ফাইজা’র ছবিটি প্রকাশ করেন।
লেখক- শাহজাহান নবীন, সহ-সম্পাদক, দৈনিক আমরাই বাংলাদেশ।