• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০

তাজউদ্দীন আহমদ: স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার

তাজউদ্দীন আহমদ: স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার

ফাইল ছবি

ফিচার ডেস্ক

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম ‘তাজউদ্দীন আহমদ’। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক জ্ঞানের চৌকস এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধকালীন ‘মুজিবনগর সরকার’-এর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গাজীপুরের এই কৃীতি সন্তান। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক কীর্তিমান এই জননেতা পেয়েছেন বিবিসি জরিপে শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের ‘অন্যতম’ একজনের খেতাব।

জন্ম ও মৃত্যু:

তাজউদ্দীন আহমদ ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুর কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৌলভী মো. ইয়াসিন খান এবং মায়ের নাম মেহেরুননেসা খান। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় হত্যার শিকার হন।

ব্যক্তিগত জীবন

তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। জোহরা তাজউদ্দীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। তাজউদ্দীন-জোহরা দম্পতির ৪ সন্তান রয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদের বড় মেয়ে শারমিন আহমদ রিপি, মেজো মেয়ে লেখিকা ও কলামিস্ট সিমিন হোসেন রিমি, মাহজাবিন আহমদ মিমি ও একমাত্র ছেলে তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। সোহেল তাজ গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

তাজউদ্দীনের শিক্ষাজীবন

বাবা মৌলভী মো. ইয়াসিন খানের হাতেই তাজউদ্দীন আহমদের লেখাপড়ার হাতেখড়ি। বাবার কাছেই প্রথম আরবী শিক্ষা গ্রহণ করেন তাজউদ্দীন। পরে তিনি নিজ গ্রামের পাশর্^বর্তী ভূলেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন কোরআনে হাফেজ। জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান বিশ^বিদ্যালয়) থেকে তিনি ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বি.এ (সম্মান) ডিগ্রী লাভ করেন তাজউদ্দীন।

রাজনৈতিক জীবন

১৯৪৩ সালে তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু। আবুল হাশিম তখন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাজউদ্দীনও বৈঠকে অংশ নেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা ও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা জেলা আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এই গুণী রাজনীতিক। ১৯৫৪-এর নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদককে পরাজিত করে পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধু যে ছয়দফা দাবি উত্থাপন করেন, সেই সম্মেলনে তাজউদ্দীনও যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ।

মুক্তিযুদ্ধ ও তাজউদ্দীন

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু পরাজিত হয়েও ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে। শেখ মুজিবের ডাকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। তাজউদ্দীনের ভাষায়, ‘আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো: একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।’

প্রথমে আত্মরক্ষা তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পাল্টা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন তাজউদ্দীন আহমদ। প্রথমে তিনি নিজেকে আত্মগোপন করেন এবং যুদ্ধকে সংগঠিত করার জন্য সীমান্তের দিকে যাত্রা করেন। ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি কুষ্টিয়া হয়ে ভারত সীমান্তে পৌছান। ওই সময় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন তাজউদ্দীন আহমদ।

ভারত পৌছানোর পর কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দেন তাজউদ্দীন আহমদ। ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন মিত্র দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। ১৯৭১ এর ১০ এপ্রিল ‘মুজিবনগর সরকার’ নামে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন তিনি। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দীন আহমদ।

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ বাংলাদেশ সরকারের নেতৃবৃন্দ ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট পেশ করেন।

তাজউদ্দীনকে নিয়ে তৈরি হয়েছে যা

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল ২০০৭ সালে তাজউদ্দীন আহমেদকে নিয়ে “তাজউদ্দীন: বিস্মৃত বীর” নামক প্রামাণ্য তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন।

লেখক সুহান রিজওয়ান ২০১৬ সালে প্রকাশিত তার “সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ” নামক রাজনৈতিক উপন্যাসে তাজউদ্দীন আহমেদের চরিত্রকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন।

গাজীপুর জেলার সদর থানায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গতাজ অডিটোরিয়াম মিলনায়তন তাজউদ্দীন আহমদের নামে নামকরণ করা হয়েছে।

০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৪৪পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।