• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০

এম এ জি ওসমানী : যোদ্ধা থেকে এক বিস্ময়কর জেনারেল

এম এ  জি ওসমানী : যোদ্ধা থেকে এক বিস্ময়কর জেনারেল

ফাইল ছবি

ফিচার ডেস্ক

অত্যন্ত মেধাবী এক যুবক, যিনি কিনা স্কুলের কোনো পরীক্ষায় কখনো প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হননি। বৃটিশ সরকারের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা বাঙালি সেই যুবকের হাত ধরেই এসেছিল স্বাধীনতা। পাকিস্তানের শোসন পীড়নের বিরুদ্ধে যে বারুদ এই বাংলায় জ্বলে উঠেছিল, সেই বারুদের যেন তাজা ঘি ছিলেন তিনি। বলছি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী’র কথা।

এম এ জি ওসমানী নামেই তিনি অধিক পরিচিত। বাংলাদেশের প্রথম সেনাপতি এই বীর যোদ্ধা। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের এক আতঙ্ক ছিলেন গুণী এই জেনারেল। সুনামগঞ্জের এই কৃতি সন্তানের জীবন নানা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছে। বিবিসি বাংলা জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় রয়েছেন এম এ জি ওসমানী।

জন্ম

এম এ জি ওসমানী ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার (অধুনা ওসমানী নগর উপজেলা) দয়ামীরে। তাঁর বাবার নাম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান। মায়ের নাম জোবেদা খাতুন। খান বাহাদুর মফিজুর রহমানের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ওসমানী।

শিক্ষা

বাবা মফিজুর রহমানের চাকরির সুবাদে ওসমানীর শৈশব-কৈশোর কেটেছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। বৃটিশ সরকারের অধীন চাকরি করায় ওসমানীর বাবা বদলির আদেশ নিয়ে সুনামগঞ্জ থেকে মেঘালয়ের গোহাটিতে চলে যান। ১৯২৩ সালে ‘কটনস্ স্কুল অব আসাম’-এ ভর্তি হন তিনি। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন ওসমানী। মেধাবী ওসমানী তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করতেন।

১৯৩২ সালে সিলেট গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুলে ভর্তি হন ওসমানী। ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে ওসমানী প্রথম স্থান অর্জন করায় ব্রিটিশ সরকার তাকে প্রাইওটোরিয়া পুরস্কার প্রদান করে। পরে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

সেনাবাহিনীতে যোগদান ও পরবর্তী

১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ-ভারতীয় মিলিটারি একাডেমীতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং কমিশনড লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে বার্মা (মিয়ানমার) সেক্টরে কাজ করেন। ১৯৪২ সালে ওসমানী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর হিসেবে পদোন্নতি পান। দেশবিভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৭ অক্টোবর ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ওই সময় তার পদমর্যাদা ছিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল। ১৯৪৯ সালে তিনি চীফ অফ জেনারেল স্টাফের ডেপুটি হন।

১৯৫১ সালে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক নিযুক্ত হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক জীবন

এম এ জি ওসমানী ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ এর নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ওসমানী। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭৪ সালে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে সংসদ সদস্য, মন্ত্রিত্ব এবং আওয়ামী লীগের সদস্য পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে ওসমানী

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ওসমানী সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা উল্লেখ করে এম এ জি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে এবং ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। ওসমানী'র নির্দেশনা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধকালীন সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জেনারেল পদমর্যাদা (অক্রিয়) প্রদান করা হয়।

মৃত্যু

ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার সংলগ্ন উদ্যানে তাকে সমাহিত করা হয়।

৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:৪০পিএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।